da4ba7d1b5688305010f9df38ec6fbfe045d25e0 Most Terrible horror ghost stories in bangla: সাদা ডাইনির কুঠি
name="propeller" content="2ed678d440884c082cf36a57cdf105f7"

Monday, December 11, 2017

সাদা ডাইনির কুঠি


Mystical ghost woman in white long shirt reach out her hand on white




সাদা ডাইনির কুঠি

...
...
....লেখক:জাকারিয়া খান
....
There was a land of Cavaliers and Cotton Fields called the Old South. Here in this pretty world, Gallantry took its last bow. Here was the last ever to be seen of Knights and their Ladies Fair, of Master and of Slave. Look for it only in books, for it is no more than a dream remembered, a Civilization gone with the wind.
'কি সুন্দরভাবে মিথ্যে কথাগুলো সাজানো দেখ। আমাদের দেশের নীল আর চা, আমেরিকার তুলো আর তামাক, ক্যারিবিয়ানের চিনি - সাহেবদের এইসব ক্যাশ ক্রপ, যার সাথে কয়েকশো বছরের একটানা জঘন্য অপরাধ আর অমানুষিক অত্যাচারের ইতিহাস জড়ানো। অথচ এই প্ল্যানটেশন হাউস বা কুঠিবাড়িগুলো অসম্ভব চার্মিং, এদের নিয়ে কত গল্প-উপন্যাস, শিল্প, সঙ্গীত। এগুলোই সভ্যতার পিনাকল, রোম্যান্টিক গল্পের পটভূমি, এখানে সিনেমার স্যুটিং হয়, ট্যুরিস্টরা এগুলো দেখতে ভিড় জমায়। এই যেমন আমরা এসেছি। কিন্তু কন্যান ডয়েল সেই যে শার্লক হোমসকে দিয়ে বলিয়েছেন না - এই ম্যানর হাউসগুলো সব রকম অপরাধের তীর্থস্থান' একটানা কথাগুলো বলে সঞ্জয় দম নিতে থামল। সৌম্যা ওর কাঁধে মাথা রেখে হাসছে।
'হয়েছে, আর ভয় দেখাতে হবে না। এটা আরেকটা জালি হানাবাড়ি, স্রেফ ট্যুরিস্ট ঠকানো জায়গা, এর থেকে সমুদ্রে থাকলেই পারতাম।'
এখান থেকে সমুদ্রটা দেখা যায়না কিন্তু হাওয়ার ঝাপটায় সৌম্যার চুল এলোমেলো। নারকেল আর কৃষ্ণচূড়া গাছের ফাঁক দিয়ে পুরোনো কুঠিবাড়িটার রাজকীয় চেহারা দেখা যাচ্ছে, তার সামনে সবুজ ঘাসজমি, আদ্যিকালের পাথরে বাঁধানো রাস্তা, দুপাশে ফুলে ভরা নানারঙের জবা, ফ্ল্যামেনকো, আর বোগানভিলিয়ার ঝোপ। ওদের দলটা এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। ওরা সবাই হিউসটন এলাকার প্রবাসী বাঙালি, দল বেঁধে প্রত্যেক বছরই কোথাও না কোথাও যায়, এবার এসেছে জ্যামাইকাতে। নানা বয়সের পরিবার, তার মধ্যে সঞ্জয় আর সৌম্যা সবচেয়ে ছোটো, ওদের বিয়ের পাঁচ বছরও হয়নি, যদিও বিয়ের আগে কলেজ জীবন থেকেই ওরা একসাথে থেকেছে বেশ কিছুদিন। সঞ্জয় ডাক্তার, হিউস্টনের একটা নামকরা মেডিক্যাল সেন্টারে কাজ করে, ফার্মাসিউটিক্যাল রিসার্চে ওর বেশ নামডাক আছে। ওদের মধ্যমণি সৌমিত্রদা, পঞ্চাশ ছাড়িয়েও চিরযুবক, পেশায় ইমিগ্রেশন ল'ইয়ার কিন্তু রিয়াল এস্টেটের ব্যবসায় অনেক টাকা করেছেন। হিউস্টনের দেশি মহলে উনি একজন কেউকেটা লোক। শহরে বাঙালির সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান, অর্থাৎ দুর্গাবাড়ি প্রতিষ্ঠায় ভদ্রলোকের মস্ত অবদান আছে, কিন্তু তাই বলে কোনো গ্রামভারী চালিয়াতি ভাব ওঁর স্বভাবে নেই। সবার সঙ্গে হৈ হৈ করতে ভালোবাসেন, একেবারে মাইডিয়ার মাটির মানুষ। ওঁর স্ত্রী অরুণাও খুব পপুলার ছিলেন। প্রায় দেড় বছর আগে বিনামেঘে বজ্রপাতের মতোই অরুণা হঠাৎ করে হাইওয়েতে একটা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান। তারপর নিজেকে বেশ গুছিয়ে নিয়েছিলেন সৌমিত্রদা। গোটা হিউস্টনের বঙ্গসমাজেই একটা শোকের আবহাওয়া নেমে এসেছিল। এবার অনেক বলে কয়ে ওরা সৌমিত্রদাকে আসতে রাজি করিয়েছে কিন্তু এখনও উনি খুব ডিপ্রেসড, সবাই প্রাণপণে ওঁকে চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করছে।
'সৌমিত্রদা এই রোজ হলের ইতিহাসটা বেশ গা ছমছমে, নয়? আরেকবার গল্পটা বলুন না।'
ওরা সবাই বাড়িটার গেটের সামনে জমায়েত হয়েছে। সৌমিত্রকে বাদ দিলে তিনটে পরিবার, চন্দন আর এষা, সঞ্জয় আর সৌম্যা, সুপ্রতীক এবং মিলি। একমাত্র মিলিই চাকরি করে না কিন্তু ও সাংঘাতিক কাজের মেয়ে, ওকে ছাড়া এইসব দল বেঁধে হইহুল্লোড়, বেড়াতে যাওয়ার কথা ভাবাই যায়না। কোথায় কি ডিল পাওয়া যায়, কবে প্লেনের টিকিট সস্তা হবে, বাচ্চারা কি করবে, কোন রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া হবে, সবেতেই মিলি আর মিলি। ওকে দেখতেও বেশ নায়িকা নায়িকা, দারুণ রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়, মধ্য তিরিশেও ছিপছিপে, কাঁধ অবধি স্টেপকাট কালো চুলের ফ্রেমে ওর ধারালো মুখশ্রী, সেখানে সবসময় হাসির আলো জ্বালা থাকে। হাল্কা আইশ্যাডোর ফাঁকে ওর গাঢ় বাদামি ব্যস্ত চোখদুটো সবসময় চারদিকে নজর রাখছে। সৌমিত্রদার হাতে ক্যারিবিয়ানের কলোনিয়াল ইতিহাস বইটাও মিলির চোখ এড়ায়নি, তাই এই ফাঁকে ওঁকে দিয়ে একটু কথা বলানোর সুযোগটা ও ছাড়বে না। গল্পের গন্ধ পেয়ে দলটা ঘন হয়ে বসল। আকাশ মেঘলা, দূরে সমুদ্রের উপর সন্ধ্যা নামছে, একটু বাদেই শুরু হবে রোজ হলের বিখ্যাত ঘোস্ট ট্যুর। সৌমিত্রদা বইটা বন্ধ করে সোজা হয়ে বসলেন।
'ওই তো সঞ্জয় বলছিল না—গন উইথ দা উইণ্ড। সুনীল সাগরের শ্যামল কিনারে এইসব স্বর্গদ্বীপের ইতিহাস কিন্তু শুধু ঘাম আর রক্তে চোবানো। যে ভদ্রলোককে সব বোম্বেটেদের আদিপুরুষ বলা যায় সেই ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯৪ সালে তাঁর দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রায় এখানে নোঙর ফেলেছিলেন। দ্বীপের বাসিন্দা অ্যারাওয়াক উপজাতির লোকেরা (উনি যাদের ইণ্ডিয়ান ঠাউরেছিলেন) ছিল অতি শান্তিপ্রিয় বোকাসোকা টাইপের, তারা বেশ উৎসাহ করেই অতিথিসৎকার করতে এসেছিল। স্প্যানিয়ার্ডরা যখন দেখল যে দ্বীপে সোনাটোনা কোথাও নেই তখন বাধ্য হয়ে ওই লোকগুলোকেই শিকলে বেঁধে জাহাজের খোলে পুরে ফেলল। জাহাজ ভাড়াটা তো তুলতে হবে, তাছাড়া বেচারাদের খ্রীষ্টান করে নরকের হাত থেকে বাঁচানোর দস্তুরি হিসাবে পুণ্যও কিছুটা জমা হয়ে গেল। স্প্যানিয়ার্ডরা অনেকদিন সমুদ্রে থেকে বোর হয়ে গেছিল কিনা, নেটিভদের নিয়ে নানারকম খেলা করে ওরা বেশ আমোদ পেত। যেমন কিনা মেয়েগুলোকে পাইকারিভাবে বিছানায় তোলা আর ছেলেগুলোর হাত-পা কেটে তরোয়ালের ধার পরীক্ষা করা। সে যাক কিছু দো-আঁশলা বাদ দিয়ে গোটা জাতিটাই প্রায় একশ বছরের মধ্যে মরে ফর্সা হয়ে গেল, সেই জায়গাটা দখল করল হেনরি মর্গ্যানের মতো জলদস্যুরা আর আফ্রিকা থেকে আমদানি করা নিগ্রো ক্রীতদাসের দল। এর মধ্যে ইংরেজরা এসে স্প্যানিশদের হটিয়ে দিয়েছে, তারা ব্যবসাদার লোক, জ্যামাইকার মাটিতে যে অন্যরকম সোনা ফলতে পারে তার খবর পেতেও তাদের দেরি হল না। ১৭১৬ থেকে ১৮৩৪ অবধি জ্যামাইকা হয়ে উঠল দাসব্যবসার একচেটিয়া ঘাঁটি। হাজার হাজার আফ্রিকানকে জাহাজ বোঝাই করে আখের ক্ষেতে চালান করা হতে থাকল। তখন সারা ক্যারিবিয়ান আর দক্ষিণ আমেরিকা জুড়ে রমরমিয়ে এইসব ক্যাশ ক্রপের ব্যবসা চলছে—চিনি, তুলো, কফি, তামাক। মানুষ খাটিয়ে লাভ সবচেয়ে বেশি শুধু জন্তুজানোয়ারের থেকে সহ্যক্ষমতা কম বলে মানুষগুলো একটু তাড়াতাড়ি মারা যায় এই যা। জাহাজের খোলে বমি করতে করতেও মরে বেশ কতগুলো। প্রথমদিকে এইসব খুচরো অসুবিধা কেউ গায়ে মাখেনি। শ'খানেক বছর পরে কিছু কিছু ঝামেলা দেখা দিল বটে। এই যে প্ল্যানটেশনটা দেখছিস এইরকম হাজার হাজার একরের সম্পত্তিগুলোয় মালিক আর দাসের অনুপাত দাঁড়িয়ে গেল ১:৪০। গণসংস্কৃতির প্রবাহ এমনই জিনিস যে চাবুক, শিকল, ধর্ষণ, ধর্মান্তর কিছুই তার চোরাস্রোত আটকাতে পারেনা। তাই হাইতি থেকে লুইসিয়ানা অবধি শিকড় ছড়িয়ে দিল এক অদ্ভুত ভাষা ও সংস্কৃতি -- ক্রিওল। অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলোর মতো গড়ে উঠলো গান আর নাচের ছন্দ, ধর্ম আর মিথোলজি। আমাদের দেশের প্রান্তিক জনজাতিগুলোর মতন প্রকৃতির সঙ্গে আষ্টেপিষ্টে জড়ানো এই সংস্কৃতির কেন্দ্রে আছে ভুডু প্র্যাকটিস। কালোজাদু বদনাম নিয়ে ভুডু অনেক লোম খাড়া করা গল্পের বিষয় হয়েছে বটে কিন্তু আর পাঁচটা পুরোনো ধর্মের সঙ্গে ওর খুব একটা পার্থক্য নেই। সে যাক এই রোজ হলের গপ্পোটা যাকে বলে সাংঘাতিক--বিকৃতকামা নারী, মারণ-উচাটন, অকথ্য অত্যাচার আর ধারাবাহিক খুব সব একসাথে পাঞ্চ করা। তাইজন্য না দুনিয়ার লোক এই সাদা ডাইনির কুঠিতে ভুতুড়ে সন্ধ্যা কাটাতে আসে। অবশ্য এখানে যা দেখবে পুরোটাই অভিনয়।'
'আমার বাবা এইসব বীভৎস ব্যাপার ভালো লাগে না। সৌমিত্রদা ইতিহাসের লেকচারটা বন্ধ কর প্লীজ। রাত্তিরবেলা এইসব বিদঘুটে ভূতের কেত্তন না দেখলেই নয়?' এষার গলায় বেশ একটু বিরক্তি। 'এই যে মহিলা অ্যানি পামার, এই বাড়ির মালকিন, সত্যিই ডাইনি ছিল নাকি--পর পর তিন স্বামীকে খুন করেছিল?'
'আসলে পুরো গল্পটা শুনলে কিছু কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। সে যুগে মেয়েদের যৌন স্বাধীনতা জিনিসটা বরদাস্ত করা হতনা, অখ্রীষ্টান শয়তানি কারবার বলে লেবেল মেরে দেওয়াই দস্তুর ছিল।' সৌমিত্রদা বললেন। 'অ্যানির বাবা-মা ব্রিটিশ, ভাগ্য ফেরাতে হাইতি দ্বীপে এসেছিল, সেখানে দুজনেই ইয়েলো ফিভারে মারা যায়। ও ধাইমার কাছে বড়ো হয়, সে বুড়ি আবার ছিল প্ল্যানটেশনের এক নামকরা ভুডু প্রিস্টেস। অ্যানিকে সে নিজের মেয়ের মতো মানুষ করেছিল, ইউরোপীয় সামাজিক শিক্ষার সঙ্গে ভুডু তন্ত্রমন্ত্রে তালিম দিতে ভোলেনি। শোনা যায় ১৮২০ সালে অ্যানি বেশ শাঁসালো কোনো ভদ্রলোক ধরে বিয়ে করার জন্য জ্যামাইকাতে হাজির হয়। সদ্য বড়লোক জ্যামাইকান ঔপনিবেশিক সমাজে তখন বিবাহযোগ্যা ইংরেজ তরুণীর বেজায় অভাব। কলোনির ভদ্রলোকেরা খুশিমতো দোআঁশলা পয়দা করতে পারেন কিন্তু সমাজে কলকে পেতে হলে কিংবা সম্পত্তি রেখে যাবার জন্য আইনমাফিক খাঁটি ইউরোপীয় রক্তের বৌ-বাচ্চা চাই। অ্যানি ছিল ছোটখাটো চেহারার এক রহস্যময়ী রূপসী, প্রথাগত গ্রুমিং আর সভ্যতার পালিশ ভেদ করে ফুটে বেরুত ওর আদিম আকর্ষণ। জন পামার নামে এক উঠতি বড়লোক ওর প্রেমে পাগল হয়ে গেল। এই যে দেখছো রোজ হল, এর চারপাশে তখন ছিল কয়েক হাজার একর জমি, দুশো ক্রীতদাস আর জনা পঞ্চাশ খাসচাকর, নায়েব, ওভারসিয়ার নিয়ে জন পামারের বিরাট প্ল্যানটেশান। বিয়ের বছরখানেকের মাথায় জন পামার রহস্যজনকভাবে মারা গেলেন, অ্যানি পামার এই বিরাট সম্পত্তির মালকিন হয়ে বসল, ততদিনে পুরো তল্লাটে রটে গেছে যে অ্যানি পামার আসলে ডাইনি, সেইই তুকতাক করে স্বামীকে খুন করেছে। তাতে অবশ্য বিয়ের বাজারে তার দর কমেনি। অ্যানি তারপর আরো দুবার বিয়ে করে এবং সেই দুই স্বামীও নাকি অল্পদিনের মধ্যেই মারা যায়। মহিলা তার বিরাট সম্পত্তি কড়া হাতে শাসন করত, নিষ্ঠুরতায় ও অন্যান্য দাসমালিকদের বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছিল নাকি। রোজ হলের চাকরবাকররা তাদের কর্তামাকে যমের মতো ভয় পেত। চাবুক মারা থেকে শুরু করে হাত পা কেটে দেওয়া কিংবা গুমঘরে আটকে রাখা, এসব তো নিয়মিত ছিলই, মাঝে মাঝে ভুডু অনুষ্ঠানে টাটকা রক্তের দরকার পড়লে, অ্যানি নাকি অবাধ্য দাসদাসীদের বাচ্চাগুলোকে তুলে আনত। মাঝরাত্তিরে শোনা যেত রক্ত জমানো চিৎকার। অ্যানির নাম হয়ে গেল রোজ হলের সাদা ডাইনি।
'অ্যানির সবচেয়ে ভয়ানক খেলা ছিল স্বাস্থ্যবান যুবক ক্রীতদাসদের নিয়ে, যাদের ও বেছে বেছে কিছুদিনের জন্য নিজের বিছানায় তুলতো। সাদা ডাইনির অস্বাভাবিক যৌনক্ষুধা মেটানোর পর সেই ক্রীতদাসদের কেউ আর খামারের কাজে ফিরতে দেখেনি, তারা সব নাকি রক্তাপ্লতায় মারা যেত। তাদের ভুতেরা এখনো এই মাঠে হানা দিয়ে ফিরছে, সুন্দরী মেয়ে দেখলেই—'
'ওরে বাবা, প্লীজ হোটেলে ফিরে চল!' এষার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। এতক্ষণে অন্ধকারও দানা বেঁধে উঠেছে, সাদা খামারবাড়িটার গায়ে লাল আর সবুজ রঙের আবছা আভা। ভূতের কাণ্ডকারখানা শুরু হল বলে, বাসভর্তি ট্যুরিস্ট হাজির হয়েছে তারা ব্যাচে ব্যাচে বাড়িটার ভেতর ঢুকবে। সৌমিত্রদাও গল্পটা প্রায় শেষ করে এনেছেন।
'অ্যানি মাত্র ত্রিশ বছর বয়েসে তার শোবার ঘরে খুন হয়। টাকু নামে যে ক্রীতদাস তাকে খুন করেছিল সেও ছিল অ্যানির প্রেমিক এবং ভুডু গুণীন। হয়তো মন্ত্রবলেই সে বুঝে ফেলেছিল যে তার দিন শেষ হয়ে এসেছে। তাছাড়া টাকু ছিল কিছুটা বয়স্ক, তার নাকি একটি মেয়েও ছিল। হবি তো হ, সেই মেয়েরই স্বামীর দিকে পড়লো সাদা ডাইনির নজর। ছেলেটি ভালো, নতুন বৌকে খুব ভালোবাসে, তাকে ছেড়ে ডাইনির বিছানায় যেতে চায়নি। জানতে পেরে অ্যানি যাদুবিদ্যা প্রয়োগ করে, টাকুর মেয়েটাও এক সপ্তাহের মধ্যে শুকিয়ে বিছানার সাথে মিশে যায়। রাগে, দুঃখে পাগল হয়ে টাকু গোপন পথে অ্যানির ঘরে ঢোকে, তারপর বিছানাতেই তাকে গলা টিপে খুন করে। টাকুকে গুলি করে মারে এক ওভারসিয়ার, তার সঙ্গে সঙ্গেই সব ক্রীতদাসেরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। রোজ হলের এই বিদ্রোহটা হয়েছিল ১৮৩০ সালে, নথিপত্রে তার হদিশ পাওয়া যায়। বাকি গল্পটার কোনো ঠিকঠাক প্রমাণ নেই, সাদা ডাইনির কাণ্ডকারখানা হয়তো পুরোটাই যাদুবাস্তব। সেই আমলে লোকে এমনিতেই অল্পবয়েসে মারা যেত। জ্যামাইকা তখন গুণ্ডা বদমায়েশ আর জলদস্যুদের আড্ডা। সুন্দরী বড়লোক বিধবাকে ছিঁড়ে খাবার জন্য লোকের অভাব ছিল না। ইউরোপ আর আফ্রিকা দুজায়গাতেই ডাইনি নিয়ে লোকের অবসেশন আছে, কত মেয়েকে এই বদনাম নিয়ে মরতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। অ্যানির বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হয়তো ছিল ওর ওই ডাইনি বদনামটাকে আরো ভয়াবহ করে তোলা যাতে কেউ ওর দিকে নজর দিতে ভয় পায়। ওটাই হয়তো ছিল ওর এমপাওয়ারমেন্টের একমাত্র উপায়। সে যাই হোক অ্যানির কবর দেওয়া হয়েছিল বাড়ির পিছনের জমিতে, কিন্তু সে নাকি সাদা ঘোড়া আর চাবুক নিয়ে প্রতি রাতে এখনও তার সম্পত্তি টহল দিয়ে বাড়ায়। ১৯৭৭ সালে জন রলিন্স বলে এক ভদ্রলোক বাড়িটা কিনে নিয়ে মেরামত করান, রক স্টার জনি ক্যাশ এখানে কিছুদিন ছিল। সেই গানবাজনা আর পার্টির ঠেলাতেই কিনা কে জানে, এখানকার প্রেতাত্মারা বোধহয় একটু কমজোর হয়ে পড়েছে। তাও এখানে কেউ রাত কাটাতে চায়না। এখন এটা রিটজ-কার্লটন গ্রুপের হানাবাড়ি অন ডিসপ্লে, ভালোই রোজগারপাতি হয় কিন্তু ঠিক দশটার সময় চাবি বন্ধ, সব শুনশান। এখানে একটা আয়না আছে সেটায় নাকি এখনো অ্যানির ছবি দেখা যায়, অনেকে ফটোও তুলেছে। যাকগে অনেক বকবক হল, এবার চল, আমাদের ট্যুরের সময় গেছে।' এষা কিছুতেই যেতে রাজি হল না, ওর মেজাজ একেবারে খারাপ হয়ে আছে। অগত্যা চন্দনও থেকে গেল বাসের কাছে, বাকিরা গাইডের সাথে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। গা ছমছমে একটা পাথরে বাঁধানো কোর্টইয়ার্ড, তার মাঝখানে একটা আদ্যিকালের বার, সেখানে দু-একজন বসে রাম খাচ্ছে। চারদিকে দাসব্যবসায়ীদের যন্ত্রপাতি ঝোলানো, মরচে ধরা লোহার শেকল, চাবুক, তালাচাবি আর বিকট চেহারার জাঁতাকল, যেগুলো নাকি খামারের চারদিকে পাতা থাকত। দাসেরা পালাতে গিয়ে ভুল জায়গায় পা ফেললেই লোহার দাঁতে পা আটকে যাবে, তখন অ্যামপুট করে বার করা ছাড়া উপায় নেই। তারপর তাদের একটু একটু করে পচে মরার জন্য গুমঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হত। বারের পিছনেই সেই গুমঘরে ঢোকার গুপ্ত দরজা। দুদিকে ঘোরানো সিঁড়ি, উঠতে গেলে বিচ্ছিরি মচমচে আওয়াজ, ঝাড়লণ্ঠনগুলো টিমটিম করে জ্বলছে, ঘোলাটে আলো-আঁধারির মধ্যে বিদঘুটে রং করা দেওয়াল আর অয়েল পেন্টিং। ভুতের ট্যুরটার খুব ভালো কোরিওগ্রাফি, মাঝে মাঝেই সেকালের পোষাক পরা ক্রীতদাসদের দেখা যাচ্ছে, নড়ে উঠছে টেবিলচেয়ার, মেঝের ওপর ঘুরপাক খাচ্ছে কুয়াশা, পিলে চমকানো চিৎকার করে দৌড়ে পালাচ্ছে কারা যেন। ঘন্টাখানেকের ট্যুর শেষ হবে অ্যানির কবরে, সেখানে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ধুপ করে একটা আওয়াজ হল, তারপর মাটির ওপর শেকল ছেঁচড়ে নিয়ে যাবার শব্দ। সৌম্যা ভুতটুত মানে না, কিন্তু ও অজান্তেই সঞ্জয়ের হাত ধরে ফেলেছে শক্ত করে।
'কি সৌমিত্রদা? থেকে যাবেন নাকি রাত্তিরে? মনে হচ্ছে ভূত দেখার এই সুবর্ণ সুযোগ। সৌমিত্রদা—' সঞ্জয় উত্তর না পেয়ে এদিক ওদিক তাকালো।
'আমি দেখলাম উনি দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। নিচের মাঠে ওরা ভূত সেজে কিসব নাচগান করছিল।' সৌম্যা বলল।
'চল, বাসে ফেরার আগে ডেকে নেব। নির্ঘাৎ ওই ভৌতিক বারে বসে রাম টানছে।' সুপ্রতীকের কথা শেষ হতে না হতেই অন্ধকার চিরে একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার শুনতে পেল সবাই। এষার গলা - 'হেল্প! প্লীজ হেল্প!!'
পাথরে বাঁধানো উঠোনের উপর ঘাড় গুঁজে পড়ে আছেন সৌমিত্রদা, একটা পা অস্বাভাবিকভাবে কোমর থেকে মুচড়ে রয়েছে, মাথাটা রক্তে মাখামাখি, দেখলেই বোঝা যায় মানুষটা উপরের বারান্দা থেকে পড়ে গেছে। এষার পুরো হিস্টেরিয়া, দাঁতে দাঁত লাগিয়ে গোঁ গোঁ করছে, চন্দন তাকে নিয়ে ব্যস্ত। ভূতের বাড়ির ম্যানেজার ছুটে এসেছেন। সৌমিত্র অজ্ঞান, কিন্তু তখনো বেঁচে আছেন। সঞ্জয় ওঁর মাথাটাকে সাপোর্ট দিয়ে, শ্বাস চালু রাখতে চেষ্টা করছে। এর মধ্যেই পুলিস আর অ্যাম্বুলেন্স হাজির হল, ঘন্টাখানেকের মাথায় ওরা সকলেই হাসপাতালে। ওদের ট্রিপ ইনসিওরেন্স করা আছে, একটু বাদেই রোগীকে মায়ামিতে এয়ার-লিফট করা হবে। ওদের ছুটি এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে।
'কি বলছিস সৌম্যা? লোকটা হাসপাতালে পড়ে আছে আর তোরা ওর বদ 

No comments:

Post a Comment